spot_img
Homeগজারিয়াএস ডি খান : গজারিয়ায় গর্ব

এস ডি খান : গজারিয়ায় গর্ব

সিরাজ-উদ্-দৌলা খান ছিলেন তৎকালীন মুন্সীগঞ্জ এর প্রান পুরুষ।তিনি এস ডি খান নামেই পরিচিত ছিলেন।

কলকাতায় অবস্থিত বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটর একজন সামান্য উচ্চমান সহকারী পদ থেকে পূর্ব পাকিস্তান সরাকারের সচিবালয়ের অন্যতম শীর্ষ পদে সমাসীন হয়েছিলেন।
সততা, দক্ষতা, নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের গুণেই তার পক্ষে এই বিরল উন্নতি সম্ভবপর হয়েছিল। কিশোর বয়ষ থেকেই তিনি সমাজসেবামূলক মনোভাবাপন্ন ছিলেন। তার জীবনের ব্রত ছিল অকাতরে মানুষের সেবা করা।
সে কারনেই তিনি পরিণত বয়সে কলকাতা প্রবাসীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন #গজারিয়াজনকল্যাণসমিতি।
তিনি গজারিয়া মানুষের অর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রকৃত নায়ক।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

জনাব খান ১৯০৮ সালের ২৩ জুলাই মুন্সিগঞ্জ জেলার #গজারিয়াউপজেলারভাটিবলাকী গ্রামের প্রসিদ্ধ খান পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন।
তার পিতা শমসের আলি খান ১৯২০ সাল থেকে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত হোসেন্দী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
মাত্র পাঁচ মাস বয়সে এস ডি খান তার মাকে হারান। ১৯১৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পাঁচ বছর বয়সে গ্রামের মক্তবে শিক্ষার হাতেখড়ি শুরু হয়। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন বছর পাঠ শেষ করে ১৯১৯ সালে গজারিয়া মিডল ইংলিশ স্কুলে চতুর্থ ভর্তি হন। ওখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯২২ সালে ঢাকার মুসলিম হাইস্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯২৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে ২য় স্থান অধিকার করেন মাধ্যমিক বোর্ডের ভিত্তি লাভ করেন। এই স্কুলে পড়াকালীন তিনি মেধাবী ছাত্র হিসেবে হাজী মোহাম্মদ মোহসীন ভিত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই এ পাশ করেন। এই সময় তিনি জ্যাক মেমোরিয়াল ভিত্তি লাভ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতশাস্ত্রে অনার্স নিয়ে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। শারীরিক অসুস্থতার কারনে ১৯৩১ সালে পরিক্ষা দিতে না পারায় পরের বছর বিএ পরিক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

পেশাগত_জীবন

ফলাফলের আগেই ১৯৩২ সালে প্রতিযোগিতা মূলক পরিক্ষায় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম হয়ে তদানীন্তন বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে যোগ দেন। ১৯৩৪ সালে তিনি বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরিক্ষায় অংশগ্রহন করেন। ১৯৩৫ সালে সায়ত্তশাসন দপ্তরে আপার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নিয়োজিত হন। ১৯৪২ সালে এই বিভাগের ভারপ্রাপ্ত হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ১৯৪৫ সালে হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে সমাসীন হন। ১৯৪৬ সালে গেজেটেড অফিসার হিসাবে এই দপ্তরের রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে সহকারী সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্য সায়ত্তশাসন দপ্তরে সহকারী সচিব হিসেবে যোগ দেন। তার কাজের উৎকর্ষতার গুনে ১৯৪৯ সালে বিভাগের উপসচিব পদে পদোন্নতি হন। ১৯৬৩ সালে তিনি একই বিভাগে যুগ্মসচিব হিসাবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে ১লা জুন তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহন করেন।

জনকল্যাণ সমিতি গঠন

১৯৪৬ সালে কলকাতা প্রবাসী গজারিয়ার সুধিজনদের নিয়ে গজারিয়া জনকল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে তিনি এই সমিতির সাধারণত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দেশবিভাগের পর ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ ২০ বছর এই সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

জনকল্যাণমূলককার্যক্রম

তিনি সারাজীবন গজারিয়াকে বুকে ধারণ করেছেন। জনকল্যাণ সমিতি করতে গিয়ে গজারিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মানুষের কাছেও তার গ্রহন যোগ্যতা ছিল। কলকাতায় চাকরি কারার সময় নিজ এলাকার অল্প শিক্ষিত ছেলেদের জন্য বহু চাকরির ব্যবস্থা করেন। সরকারের সুউচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থাকার কারনে এলাকার ছেলেদের ডেকে ডেকে চাকরি দিতেন। তার এই জনসেবা মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতো। এলাকার দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে গজারিয়াকে থানা রুপান্তর প্রতিটি কাজেই তিনি অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। তিনি হোসেন্দী মিডল ইংলিশ স্কুলকে উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিনত করেন। তিনি গজারিয়া মডেল হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা। তিনি নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদ নির্মাণের জন্য জমিদান ও আংশিক অর্থ সাহায্য করেন।
শেষ জীবনে গজারিয়ায় একটি হাসপাতাল নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। হাসপাতালের জমি কিনার অর্থ সংগ্রহের জন্য দ্বারে দ্বারে চিঠি লিখেছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন। ভবেরচরে জমি কিনার পর ১৯৭৮ সালে এখানে সরকারি পর্যায়ে গজারিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপিত হয় এবং ঢাকা – চট্টগ্রাম মহা সড়ক গজরিয়া উপর দিয়ে যায় শুধু তার কারনেই ।

পারিবারিক_জীবন

এস ডি খান ১৯৩৬ সালে দাউদকান্দি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট আারশাদ আলী সরকারের জ্যেষ্ঠ কন্যা মোসম্মৎ জাহান আরা খানমকে বিয়ে করেন। তিনি চার পুত্রের জনক।

জ্যেষ্ঠ পুত্র শামস-উদ্-দৌলা খান বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী।

দ্বিতীয় পুত্র শরিফ-উদ্-দৌলা খান সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব।

তৃতীয় পুত্র শামিম-উদ-দৌলা খান কনসালটেন্ট প্রকৌশলী।

চতুর্থ পুত্র শরিফ-উদ্-দৌলা খান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণাকার্যে যুক্ত।

শেষ_ইচ্ছা

মৃত্যুর মাস দেড়েক আগে এস ডি খান স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যান।
পাশের গ্রামে বাবার কবর জিয়ারত করার পর নিজ গ্রামের মসজিদের পাশে নিজের কবরের স্থান দেখিয়ে দেন। তার এই ইচ্ছে থেকে প্রমান পাওয়া যায় যে তিনি নিজ ভূমিকে তিনি কতখানি ভালবাসতেন।

মৃত্যুবরণ

১৯৭৫ সালের ২ মে সন্ধা সাড়ে ৭টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গজারিয়ার একটি নক্ষত্রোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের কর্মময় ও ঘটনাবহুল জীবনের অবসান ঘটে। এস ডি খানের ইচ্ছে অনুযায়ী তার নশ্বর দেহ ভাটিবলাকী গ্রামের মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সেই গ্রাম এখন গহীন মেঘনায়।

তথ্য সংগ্রহ: শাহাদাৎ পারভেজ এর লেখা গজারিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বই থেকে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments