ধর্ম ও নৈতিকতা

কেন এতো বিভেদ?
আমরা কি ইসলামের পতাকা তলে এক হতে পারি না!!!

লেখকঃ মাওলানা এ এস এম জুনায়েদ,
খতীব
লাখাই উপজেলা কমপ্লেক্স জামে মসজিদ (কালাউক)। লাখাই, হবিগঞ্জ।
অধ্যক্ষ,
জিরুন্ডা মানপুর তোফাইলিয়া সিনিয়র আলিম মাদরাসা।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আমার প্রানপ্রিয় উলামায়ে কেরাম ও ইসলাম দরদী নবী প্রেমিক মুসলিম ভাইয়েরা। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা আজ একই দ্বীনের অনুসারী, একই আল্লাহর বান্দা এবং একজন মহান রাসুলের উম্মত হয়ে পরস্পর কাদা ছুড়াছুড়ি ও নিকৃষ্ট দলাদলিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছি।

সামান্য মতের ভিন্নতার কারনে আমরা পরস্পরকে গালমন্দ করি। প্রতিপক্ষকে ভন্ড, ফাসেক, বেদাতী এমন কি কাফের বলতেও দ্বিধাবোধ করি না।

কোন একটি মাসয়ালায় দুইজন আলেমের মধ্যে মতবিরোধ হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার। আমাদের প্রিয় নবিজীর ইন্তেকালের পর থেকেই আমরা অনেক গুরুত্বপুর্ন বিষয়ে সাহাবীদের মধ্যেও মতবিরোধ হতে দেখেছি। এমন কি তারা পরস্পর যুদ্ধবিগ্রহে পর্যন্ত লিপ্ত হয়েছিলেন।

এ সমস্ত যুদ্ধে অনেক প্রানহানিও ঘঠেছে। তবুই সাহাবীদের কেউ কাউকে কাফের ফতোয়া দিতে ইতিহাসে পাইনি। সাহাবীদের পরে তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের যুগেও মতবিরোধ হয়েছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবেন যে, তাদের কেউ অন্য কাউকে কাফের বা ফাসেক বলে ফতোয়া দিয়েছেন।

যদি ইসলামে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের সুযোগ না থাকত তাহলে কি এতগুলি মাজহাবের দরকার হত। বিভিন্ন মাসয়ালায় সম্মানিত ইমামদের মতবিরোধের কারনেই এতগুলি মাজহাবের তৈরী হয়েছে।

এমন কি একই মাজহাবের উলামাদের মধ্যেই পরস্পর মতবিরোধ রয়েছে যা আমরা ফেকাহর কিতাবগুলি পাঠ করলে বুঝতে পারি। এমন কি তারা ফরজ বিষয়গুলি নিয়েও মতানৈক্য করেছেন।

কিন্তু কই? আমরাতো তাদের মধ্যে কোন ফতোয়াবাজি দেখি না? কেউ কি বলতে পারবেন এক মাজহাবের ইমাম অন্য মাজহাবের অনুসারী কাউকে কাফের, ফাসেক, ভন্ড, বেদাতী, ও ইয়াহুদী নাসারার দালাল বা অন্য কোন ভাষায় গালাগালি করেছেন।

আসলে মুল কথা হচ্ছে তারা ছিলেন ইসলামের বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। অহী ভিত্তিক জ্ঞানে তাদের অন্তর পরিপুর্ন ছিল। তারা আবেগে চলতেন না। একমাত্র কোরান ও হাদিসকেই তারা নিজেদের অবলম্বন মনে করতেন। কোরান হাদিসের উপর এত অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হয়েও তারা নিজেদেরকে খুবই ছোট মনে করতেন।

অন্যদের প্রতি তাদের ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। আজ আমরা কোরান ও হাদিসের ধার ধারিনা। বক্তাদের মুখ থেকে শুনে শুনে ইসলাম শিখি। সামান্যতম জানতে পারলেই নিজেকে মহাজ্ঞানী মনে করে বসি। অন্য জন কোরান ও হাদিসের দলীল দিয়ে কথা বললেও তাকে পাত্তা দেই না।

পরিনতি না ভেবে তার বিরোধ্যে লেগে যাই। এই অবস্থা আমাদের মুসলমানদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে একবার কি কল্পনা করেছেন? আজ আমাদের এই অবস্থা দেখে আমাদের পাশে থাকা অন্য ধর্মের অনুসারীরা হাসছে।

আসুন না আমরা একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য তার রাসুলের ও সাহাবাদের অনুসরন করি। কিতাব ও সুন্নাহকে আকড়ে ধরি। যারা কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী কোন কথা বলবে একমত না হতে পারলেও গালি না দিয়ে শ্রদ্ধা করি ও পরমত সহিষ্ণু হই।

আল্লাহতো আমাদেরকে ভাই ভাই হতে বলেছেন। আমি যদি আমার ভাইকে কাফের বানিয়ে ফেলি তবে সে আমার ভাই থাকবে কিভাবে। হে আল্লাহ আমাদের এক এবং তোমার খাটি বান্দায় পরিনত হওয়ার তৌফিক দাও। আমীন।

সুরা আলে ইমরান এর ১০৩ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন,
وَ اعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰہِ جَمِیۡعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوۡا ۪ وَ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ اِذۡ کُنۡتُمۡ اَعۡدَآءً فَاَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِکُمۡ فَاَصۡبَحۡتُمۡ بِنِعۡمَتِہٖۤ اِخۡوَانًا ۚ وَ کُنۡتُمۡ عَلٰی شَفَا حُفۡرَۃٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنۡقَذَکُمۡ مِّنۡہَا ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمۡ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَہۡتَدُوۡنَ ﴿۱۰۳﴾
অনুবাদঃ আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালবাসার সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেল। আর তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের কিনারায়, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বয়ান করেন, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।

পরিশেষে, আবারও সকলের প্রতি আহবান, আসুন কোরআন ও সুন্নাহের আলোকে সমবেত হই ইসলামের একই পতাকা তলে । (আমিন)