Wednesday, January 19, 2022
spot_img
Homeচিকিৎসা ও স্বাস্থ্যCOVID-19 মহামারী এবং দাঁত ও মাড়ির যত্ন

COVID-19 মহামারী এবং দাঁত ও মাড়ির যত্ন

ডাঃ এনাম আহমেদ,
সহযোগী অধ্যাপক,
ডেন্টাল পাবলিক হেলথ (ইউ.ডি.সি)

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চিনের উহান শহরে আবিস্কৃত হয় বর্তমান বিশ্বের এবং বিগত শতকের সবচেয়ে ভয়ংকর মহামারী “করোনা ভাইরাস ডিজিস COVID-19”। বিভিন্ন বিজ্ঞানী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই সময়ে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাই হাত ধোয়াকেই সবাই গুরুত্বের চোখে দেখছেন কেননা হাত এবং মুখের সংস্পর্শে এই ভাইরাসটি বিস্তার লাভ করে। তবে ভুলে গেলে চলবে না করোনা ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে মূলত নাক, মুখ ও চোখের মাধ্যমে। তাই সংস্পর্শের দিকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি আমাদের মুখের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের প্রতিও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। তাই এ ব্যাপারে নিম্নোক্ত নির্দেশাবলী মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

সৌজন্যে : রাশেদ ডেন্টাল

১. আপনার টুথব্রাশটি অন্য কারো টুথব্রাশের সংস্পর্শে আসছে কিনা সেটি খেয়াল করুন

সাধারনত ভাইরাসবাহী রোগগুলো সংক্রমনের একটি অন্যতম পথ হলো মুখগহ্বর, নাক ও চোখ। হাত ছাড়া অন্য যে বস্তুটি মুখগহ্বরের সরাসরি সংস্পর্শে আসে তা হলো আমাদের বহুল ব্যবহৃত টুথব্রাশ। সুতরাং এই টুথব্রাশের মাধ্যমেই আপনি সহজে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারেন যদি কোন ভাবে আপনার টুথব্রাশটি সংক্রমিত হয়ে থাকে। হতে পারে এই টুথব্রাশটি অন্য কেউ ব্যবহার করার মাধ্যমে কিংবা অন্যের টুথব্রাশের সাথে সংস্পর্শের কারনে। তাই যেখানে আপনি ব্রাশ করার পরে টুথব্রাশটি সংরক্ষন করেন, খেয়াল রাখতে হবে সেখানে যেন অন্য কারো টুথব্রাশ আপনার ব্রাশটিকে স্পর্শ না করতে পারে।

২. দাঁত ব্রাশ করার আগে হাত ধুয়ে নিন

হাত থেকে মুখমন্ডলে সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য আপনি হাত ধুচ্ছেন কিন্তু একই হাতে ব্রাশ স্পর্শ করার পরে সেই ব্রাশ যখন আপনি মুখে নিচ্ছেন তা থেকে রোগ সংক্রমনের আশংকা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। কাজেই ব্রাশ করার আগেও হাত ধোয়ার কথা ভুলবেন না। নিজের একটি রুটিন বানিয়ে ফেলুন। প্রথমে হাত ধুয়ে নিন, তারপর ব্রাশ করুন, ফ্লস করুন এবং মুখ ও হাত ধুয়ে ফেলুন।

৩. ব্রাশ করার পরে টুথব্রাশটি পরিষ্কার করুন

প্রতিবার সাধারণ ব্যবহারের পরে আপনার টুথব্রাশটি উষ্ণ গরম পানিতে ধুয়ে ফেলুন।যদি কোন কারনে আপনার করোনা ভাইরাস টেস্ট পজিটিভ আসে সেক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কাজেই, প্রথমে আপনার ব্রাশ গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। এর পরে একটি গ্লাসে সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট (ব্লিচ) দ্রবণ তৈরী করে ৩০ মিনিট সম্পূর্ণ ব্রাশ বা ব্রাশের মাথার অংশটুকু ভিজিয়ে রাখুন। ৩০ মিনিট পার হয়ে গেলে, পানি দিয়ে পুনরায় ব্রাশটি ধুয়ে ফেলুন এবং শুকিয়ে রাখুন।

যেভাবে ব্লিচ তৈরী করবেনঃ ৫% সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইটের ১:১০০ অনুপাতের দ্রবণ তৈরী করতে হবে। সুতরাং বাজারে পাওয়া ৫.২৫% সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট ৫০০ মিলিলিটার পানিতে ১ চা-চামচ (৫ মিলি লিটার) পরিমান মিশ্রিত করে যে দ্রবন তৈরী হবে সেটাই টুথব্রাশ পরিস্কারের জন্য উপযুক্ত ব্লিচ।

৪. টুথব্রাশ হোল্ডার

আপনার টুথব্রাশ যেন অন্য কারো ব্রাশের সংস্পর্শে না আসতে পারে সে জন্য প্রয়োজনে গ্লাস কিংবা জ্যামের জারের মত পাত্র ব্যবহার করতে পারেন এবং ব্যবহারের পর সকলের ব্রাশ আলাদা পাত্রে সংরক্ষন করতে পারেন। বাচ্চাদের ব্রাশগুলোতে অমোছনীয় কালি দিয়ে নাম লিখে রাখতে পারেন। কখনোই আপনার ব্রাশ কাউন্টারটপ কিংবা হ্যান্ড বেসিনে শুইয়ে রাখবেন না। মাঝে মাঝে ডিসওয়াশ বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ব্রাশ রাখার পাত্রগুলো পরিস্কার করে ফেলুন।

ব্রাশ ও পাত্রগুলোকে নিরাপদ স্থানে রাখুন।

আপনার টুথব্রাশটি টয়েলেট থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে রাখুন। কারন টয়েলেট এর ফ্ল্যাশ করার পরে টয়েলেটের ভেতর থেকে বাস্প বা এরোসল তৈরী হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, করোনাভাইরাস মলের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। তাই এই বাস্প আপনার ব্রাশে স্পর্শ করলে আপনি এর মাধ্যমে ঘরে থেকেও সংক্রমিত হতে পারেন। আর টয়েলেটের ঢাকনা থাকলে ফ্ল্যাশ করার আগে এটি নামিয়ে নিতে ভুলবেন না।

৫. টুথপেস্ট ব্যবহারেও সতর্ক হোন

আপনি বা আপনার পরিবারের অন্য কেউ করোনা আক্রান্ত হলে আপনারা যদি একই টুথপেস্ট ব্যবহার করেন সেক্ষেত্রে টুথপেস্ট এর টিউবটি কখনোই ব্রাশের সাথে ছুঁইয়ে ব্যবহার করবেন না। এতে ব্রাশ থেকে পেস্ট এবং পেস্ট থেকে পুনরাং অন্য আরেকটি ব্রাশ আক্রমনের সম্ভাবনা থাকে। তাই অভ্যাস বদলে ফেলুন। একটি পরিস্কার প্লেট বা পাত্রে টুথপেস্ট নিয়ে সেখান থেকে ব্রাশে লাগিয়ে নিন। হাতের কাছে পাত্র না পেলে পরিস্কার কোন কাপড়ও ব্যবহার করতে পারেন।

৬. দাঁত ব্রাশ করার সময়েও সামাজিক দুরত্ব মেনে চলুন

বাড়ির বেসিনে দাঁত ব্রাশ করার সময় এক সাথে একাধিক মানুষ ব্রাশ করবেন না। কারন গবেষণায় দেখা গিয়েছে টুথপেস্টের ফেনার সাথে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া বাতাসে প্রবেশ করে এবং তা ওই স্থানে থাকা অন্য কোন ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে।

৭. আপনার টুথব্রাশটি নিয়মিত পরিবর্তন করুন

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিনমাস অন্তর আপনার টুথব্রাশটি বদলে নতুন টুথব্রাশ ব্যবহার করুন। তিনমাসের মধ্যে যদি টুথব্রাশের আঁশগুলো ক্ষয় হয়ে যায় তবে অতিসত্বর তা বদলে ফেলুন কারন আঁশ ক্ষয় হয়ে যাওয়া ব্রাশ আপনাকে কখনই পরিপূর্ণ পরিচ্ছন্নতা দিতে পারে না। তাছাড়া নিয়মিত পরিবর্তন করলে টুথব্রাশে ব্যাকটেরিয়াও বিস্তার করতে পারে না।

আপনি আক্রান্ত হলে টুথব্রাশ বদলে ফেলুন

আপনি যদি করোনাভাইরাস আক্রান্ত হন বা হবার লক্ষন প্রকাশ পায় তবে আক্রমনের ঝুঁকি কমাতে আপনার টুথব্রাশটি বদলে ফেলুন। যদি আক্রান্ত হয়েই থাকেন, তবে রোগ থেকে সুস্থ হবার সাথে সাথেই আপনার অন্তঃবর্তীকালীন এই ব্রাশটি বদলে আরেকটি ব্রাশ ব্যবহার করুন যেন আপনি পুনরায় আক্রান্ত না হন।

৮. প্রতিদিন দুই দাঁতের মাঝে ডেন্টাল ফ্লস বা ইন্টারডেণ্টাল ব্রাশ দিয়ে পরিস্কার করুন

৯. আপনার ডেন্টিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী মাউথওয়াশ ব্যবহার করুন

আপনি যদি ডেন্টিস্টের কাছে যান তবে যেকোন ডেন্টাল চিকিৎসার পূর্বে ১% হাইড্রোজেন পারক্সাইড বা ০.২% – ১% পভিডন আয়োডিন গারগেল ব্যবহার করবেন কেননা এটি আপনার মুখে থাকা জীবানুর পরিমান কমিয়ে দিতে সক্ষম। তাছাড়া নিয়মিত ব্যবহারের জন্য মাউথ ওয়াশে পভিডন আয়োডিন (০.২% – ১%), সিটিলপাইরিডিনিয়াম ক্লোরাইড (০.০৫% – 0.১%), হাইড্রোজেন পারক্সাইড ১%, এসেন্সিয়াল অয়েল অথবা অ্যালকোহল আছে কিনা সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তবে আপনি যদি গর্ভবতী হন কিংবা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান সেক্ষেত্রে ডেন্টিস্টের পরামর্শ ব্যতীত পভিডন আয়োডিন যুক্ত মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ।

১০. আপনার বাথরুম নিয়মিত পরিস্কার রাখুন

আমরা অনেকেই বাথরুমে তোয়ালে, টুথব্রাশ বা জামাকাপড় রাখি যা এই সময়ের জন্য হানিকর। তাই সচেতনতার জন্য বাথরুমের মেঝে নিয়মিত ক্লোরিন যুক্ত উপাদান (ব্লিচ) দিয়ে পরিস্কার করুন।

১১. কোন জিজ্ঞাসা থাকলে আপনার ডেন্টিস্টের সাথে যোগাযোগ করুন ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments