spot_img
Homeবিশেষ আয়োজনধর্ম ও নৈতিকতামাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

মাতাপিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

আবু সাঈদ মোঃ জুনাঈদ
খতীব
লাখাই উপজেলা কমপ্লেক্স জামে মসজিদ (কালাউক)।
লাখাই, হবিগঞ্জ।
অধ্যক্ষ, জিরুন্ডা মানপুর তোফাইলিয়া সিনিয়র আলিম মাদরাসা।


সকল প্রশংশা মহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার জন্য, যিনি মানব মন্ডলীকে পিতামাতার মধ্যস্থতায় এই দুনিয়ায় প্রেরন করেছেন এবং মা-বাবার সাথে সদব্যবহারকে জান্নাতে যাবার উছিলা বানিয়েছেন। দরুদ ও সালাম পেশ করছি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর যিনি পিতামাতার সম্মান ও মর্যাদাকে সকলের উপরে সুপ্রতিষ্টিত করেছেন। পিতামাতা পৃথিবীতে সন্তানের জন্য আল্লাহর দেয়া শ্রেষ্ট নেয়ামত সমুহের অন্যতম। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরেই পিতামাতার মর্যাদাকে সন্তানের জন্য অপরিহার্য করেছেন। তাদের প্রতি সদব্যবহার ও কর্তব্যনিষ্ট হওয়ার তাগিদ প্রদান করেছেন। একদিকে পিতামাতার খেদমতকে আল্লাহ তায়ালা সন্তানের জন্য ফরজরুপী দায়িত্ব হিসেবে গন্য করেছেন, অন্যদিকে তাদের খেদমতের মর্যদা ও ফজিলতকে আল্লাহর নিকঠ উচ্চ মর্যদা লাভের উপায় ও সহজে জান্নাত লাভের উছিলা বানিয়েছেন। পক্ষান্তরে পিতামাতার প্রতি অবহেলা, দুর্ব্যবহার ও দায়িত্বহীনতাকে একটি জঘন্যতম গর্হিত কাজ হিসেবে গন্য করা হয়েছে। পবিত্র কালামে হাকিম ও রাসুল (সঃ) এর অসংখ্য পবিত্র হাদিসে এই বিষয়ে বিস্তারিত বর্ননা পাওয়া যায়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে নিম্নোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আশা করি এই বিষয়ে পাঠকবৃন্দের জ্ঞানের পরিধি কিছুটা হলেও সমৃদ্ধ হবে। আল্লাহ আমাদের সাহায্যকারী।
১। মাতাপিতার প্রতি সদব্যবহার করা ফরজঃ আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের ইবাদাতের পরেই মা-বাবার প্রতি সদব্যবহার ও দয়া প্রদর্শনকে সন্তানের উপর ফরজ করে দিয়েছেন। বিশেষ করে বৃদ্ধ অবস্থায় পিতামাতার প্রতি উত্তম আচরন করার জন্য তাগিদ প্রদান করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وقضي ربك ان لا تعبدوا الا اياه وبالوالدين احسانا- اما يبلغن عندك الكبر احدهما او كلاهما فلا تقل لهما اف ولا تنهرهما وقل لهما قولا كريما- واخفض لهما جناح الذل من الرحمة وقل رب ارحمهما كما ربياني صغيرا- بني اسرائيل 23-24
অনুবাদঃ (হে নবী, আপনি আপনার উম্মতদেরকে বলে দিন যে, তাদেরকে) তোমার রব (আল্লাহ তায়ালা) এই নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা মাতার প্রতি দয়াপরবশ হবে। (বিশেষ করে) যখন তাদের একজন অথবা উভয়ই তোমাদের নিকঠ বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হবে, তখন তাদের সাথে এমন কথা বলোনা যাতে তারা দুঃখ পেয়ে “উফ” শব্দটি উচ্চারন করে। এবং তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার করোনা। তাদের সাথে সর্বদা সম্মানজনক কথাবার্তা বল। আর তাদের জন্য সর্বদা তোমার দয়ার (রহমতের) ছায়া বিছিয়ে রাখ। (তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকঠ দোয়া করে) বল, হে আমার রব! আমার পিতামাতা আমাকে ছোট বেলায় যেভাবে রহম দিয়ে লালন পালন করেছে, তুমিও তাদেরকে সেই ভাবে রহম কর। সুরা বানী ইসরাইল। সুরা নিছার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
واعبدو الله ولا تشركو به شيئا وبالوالدين احسانا وبذي القربي واليتاما والمسكين والجار ذي القربي والجار الجنب والصاحب بالجنب وابن السبيل وما ملكت ايمانكم – ان الله لا يحب من كان مختالا فخورا- نساء – 36
অনুবাদঃ তোমরা আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত কর এবং তাঁর সাথে কারো শরীক করোনা এবং পিতামাতার প্রতি সদয় ব্যবহার কর। তোমাদের নিকটাত্বীয়, ইয়াতিম, মিসকিন, নিকটাত্বীয় প্রতিবেশি, আত্বীয়বিহীন প্রতিবেশি, পার্শ্ববর্তী সহচর, পথিক, এবং তোমাদের অধিনস্ত দাস-দাসীদের সাথে সদয় ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা অহংকারী দাম্ভিকদের ভাল বাসেন না।
২। পিতামাতার প্রতি সদব্যবহার পুর্ববর্তী উম্মতদের উপরও ফরজ ছিলঃ মাতাপিতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য আল্লাহর নিকঠ এতই গুরুত্বপুর্ন বিষয় যে, আল্লাহ তায়ালা পুর্ববর্তী সকল উম্মতের উপরই তা ফরজ করে দিয়েছিলেন। হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে সকল স্তরের মানুষের উপর পিতা মাতার খেদমত ও সৎ কাজে তাদের অনুসরনকে বাধ্যতা মুলক করে দিয়েছিলেন। এই দিকে ইংগিত করে সুরা বাকারার ৮৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
واذ اخذنا ميثاق بني اسرائيل لا تعبدو الا اياه وبالوالدين احسانا – وذي القربي واليتمئ والمساكين وقولو للناس حسنا – واقيمو الصلواة واتوالزكاة – ثم توليتم الا قليلا منكم وانتم معرضون- بقرة -83
অনুবাদঃ (হে নবী) স্মরন করুন সেই সময়ের কথা যখন আমি বনি ইসরাইলের নিকঠ থেকে এই মর্মে অংগীকার নিয়েছিলেম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতামাতার প্রতি সদব্যবহার করবে। এবং নিকঠ আত্বীয় ইয়াতিম, মিসকিনদের সাথে (ভাল ব্যাবহার করবে) এবং জনসাধারনের সংগে উত্তম কথাবার্তা বলবে। তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর। এরপর তোমাদের মধ্য হতে অল্প সংখ্যক ব্যতীত সকলেই (এই অংগিকার হতে) মুখ ফিরিয়ে নিলে আর তোমরা অবাধ্য হয়ে গেলে। সুরা মারইয়ামের ১২ থেকে ১৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يا يحي خذ الكتاب بقوة- واتيناه الحكم صبيا- وحنانا من لدنا وزكاة وكان تقيا- وبارا بوالديه ولم يكن جبارا عصيا- وسلم عليه يوم ولد ويوم يموت ويوم يبعث حيا- مريم – 12-15
অনুবাদঃ আল্লাহ বলেন, (আমি হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) কে বললাম) হে ইয়াহইয়া! আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারন কর। আমি তাকে শিশুকালেই হিকমাত শিক্ষা দিলাম। আমার তরফ থেকে তাকে হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা দান করলাম, সে ছিল খুবই সাবধানী। এবং আমি তাকে তাঁর পিতা মাতার বাধ্যগত করে দিলাম। ফলে সে উদ্ধত ও অবাধ্য ছিলনা। যেদিন সে জন্মগ্রহন করেছিল, যে দিন সে মৃত্যু বরন করেছিল তাঁর প্রতি শান্তি বর্ষিত হয়েছে এবং যেদিন সে আবার পুনরায় জীবিত হবে তাঁর প্রতি শান্তি রয়েছে । এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা উক্ত সুরার ৩১ থেকে ৩৩ নম্বর আয়াতে আরেকজন সম্মানিত নবী হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে বলেন,
وجعلني مباركا اينما كنت – واوصاني بالصلواة والزكاة ما دمت حيا- وبرا بوالدتي ولم يجعلني جبارا شقيا والسلم علي يوم ولدت ويوم اموت ويوم ابعث حيا- مريم- 31-33
অনুবাদঃ ঈসা (আঃ) বললেন, (আল্লাহ তায়ালা) আমি যেখানেই থাকিনা কেন, তিনি আমাকে তাঁর অনুগ্রহভাজন করেছেন। আর তিনি আমাকে যতদিন পর্যন্ত জীবিত থাকব ততদিন পর্যন্ত সালাত আদায় ও যাকাত প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেছেন। এবং তিনি আমাকে আমার মাতার প্রতি অনুগত হতে আদেশ করেছেন। এবং তিনি আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। তিনি আমার উপর শান্তি বর্ষন করেছেন যেদিন আমি জন্মগ্রহন করেছিলাম এবং যেদিন আমি মৃত্যু বরন করব ও পুনরায় জীবিত হব সেদিনও আমার উপর শান্তি বর্ষন করবেন। এভাবে আল্লাহ তায়ালার কিতাব দ্বারা এ কথা প্রমানিত হল যে, পুর্ববর্তী সকল নবীগন ও তাদের উম্মতদের উপর পিতামাতার উপর কর্তব্য পালন করা অপরিহার্য্য ছিল।
৩। পিতা-মাতার জন্য ব্যয় করাঃ মানুষ তাঁর নিজস্ব আয়-ইনকাম থেকে যা কিছু ব্যয় করে তাঁর মধ্যে পিতামাতার জন্য ব্যয় হচ্ছে সর্বোত্তম। তাদের কল্যানে নিজেদের উপার্জন থেকে অকাতরে খরচ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন। সাথে সাথে সকল আত্বীয়দের মধ্যে মাতাপিতাকে সবচেয়ে নিকটাত্বীয় বলে ঘোষনা করেছেন। সুরা বাকারার ২১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يسئلونك ماذا ينفقون – قل ما انفقتم من خير فللوالدين والاقربين واليتاما والمساكين وابن السبيل وما تفعلو من خير فان الله به عليم- بقرة -215
অনুবাদঃ (হে নবী) তারা আপনাকে বলে, আমরা কি (এবং কোথায়) দান করব। তুমি তাদেরকে বলে দাও! তোমরা তোমাদের কল্যানজনক মালামাল হতে যা কিছুই দান করনা কেন প্রথমে তোমাদের পিতামাতাকে দিবে। অতঃপর নিকটাত্বীয়, ইয়াতিম, অসহায় ও মুসাফিরদেরকে দান করবে। তোমরা কল্যান জনক যত কাজ করে থাক তাঁর সবই আল্লাহ জানেন।
৪। পিতা মাতা সন্তানের লালন-পালনকারীঃ আল্লাহ তায়ালা এতই মেহেরবান যে পিতামাতার জন্য স্বীয় সন্তানকে চক্ষু শীতলকারী বানিয়েছেন এবং পরস্পরকে সাহায্যকারী হিসেবে পরস্পরের পরিপুরক বানিয়েছেন। সন্তানের লালনপালনের দায়িত্ব পিতামাতার উপর সাব্যস্থ করেছেন, বিনিময়ে তাদের বৃদ্ধ অবস্থায় যাবতীয় দায়িত্ব পালনের ভার সন্তানের উপর অর্পন করেছেন। পস্পরের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সুরা বাকারার ২৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
الوالدات يرضعن اولادهن حولين كاملين – لمن اراد ان يتم الرضاعة – وعلي المولود له رزقهن وكسوتهن بالمعروف – لا تكلف نفس الا وسعها – ولا تضار والدة بولدها – ولا مولود له بولده – وعلي الوارث مثل ذالك – فان ارادا فصالا عن تراض منهما وتشاور فلا جناح عليهما وان اردتم ان تسترضعوا اولادكم فلا جناح عليكم اذا سلمنم مااتيتم بالمعروف- واتقو الله واعلمو ان الله بما تعملون بصير- بقرة- 233
অনুবাদঃ আল্লাহ বলেন, মায়েদের মধ্যে যারা দুগ্ধপানের মেয়াদ পুর্ন করতে চায় তারা তাদের সন্তানদেরকে পুর্ন দুই বছর দুধ পান করাবে। আর সন্তানের পিতার উপর দায়িত্ব হচ্ছে ন্যায়সংগতভাবে তাঁর মায়ের রিজিক ও পোষাক পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করিবে। কাউকে তাঁর সাধ্যের বাইরে কষ্ট দেয়া যাবে না। মাকে তাঁর সন্তানের দ্বারা ক্ষতি করা যাবে না, পিতাকেও তাঁর সন্তানের দ্বারা ক্ষতি করা যাবে না। এবং ওয়ারিশদের ব্যাপারেও একই বিধান। যদি পস্পরের পরামর্শ ও সম্মতির মাধ্যমে দুগ্ধ পান বন্ধ করতে চায় তবে ইহাতে তাদের উপর কোন দোষ নেই। আর যদি শান্তিপুর্নভাবে তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদানের বিনিময়ে কিছু প্রদান করতে ইচ্ছা কর তাতেও কোন দোষ নেই। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তায়ালা তাঁর খবর রাখেন।
৫। আল্লাহর আদেশের উপর পিতামাতার আদেশ পালন করা যাবেনাঃ মাতাপিতার প্রতি সদব্যবহারের ক্ষেত্রে কোন প্রকার সীমারেখা নেই। সর্বাবস্থায় পিতামাতার প্রতি ভাল ব্যবহার করা ও তাদের খেদমত করা সন্তানের উপর অবশ্য কর্তব্য। তাঁরা যদি অত্যাচারী হয় এবং স্বীয় সন্তানের প্রতি অবিচার ও জুলুম করে থাকে তাদের প্রতি ভাল আচরন করতে হবে। কিন্তু তাদের অনুসরন করা ও আদেশ মানার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশের উপর পিতামাতার আদেশকে মান্য করা যাবে না। তাদের আদেশ শরয়ী বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হলে আল্লাহর আদেশ প্রাধান্য পাবে এবং তাদের প্রতি আচরনিক শ্রদ্ধা রেখে আদেশ এড়িয়ে চলতে হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশনা দিয়ে বলেন,
واذ قال لقمان لابنه وهو يعظه يا بني لا تشرك بالله – ان الشرك لظلم عظيم- ووصينا الانسان بوالديه حملته امه وهنا علي وهن وفصاله عامين ان اشكرلي ولوالديك الي المصير- وان جاهداك علي ان تشرك بي ما ليس لك به علم فلا تطعهما وصاحبهما في الدنيا معروفا – واتبع سبيل من اناب الي – ثم الي مرجعكم – فانبئكم بما كنتم تعملون- لقمان – 14-15
অনুবাদঃ (হে রাসুল সঃ) স্মরন করুন সেই সময়ের কথা যখন হযরত লোকমান (আঃ) তাঁর স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, হে প্রিয় বৎস, তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করোনা। (জেনে রাখ যে) নিশ্চয় (আল্লাহর সাথে) শিরক হচ্ছে বড় ধরনের জুলুম। আর আমি মানুষকে তাদের পিতা মাতার প্রতি (ভাল আচরনের) আদেশ করছি। তাঁর মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে পেটে ধারন করেছে এবং পুর্ন দুই বছর দুধ পান করিয়েছে। যেন সে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। তাদেরতো আমার দিকেই ফিরে আসতে হবে। আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন বস্তুকে অংশিদার বানাতে চেষ্টা করে যে ব্যপারে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তাদেরকে তুমি অনুসরন করোনা। তবে দুনিয়ায় তাদের সাথে উত্তম আচরন কর। আর ঐ ব্যক্তির পথ অনুসরন কর যে আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। অতঃপর তোমাদেরকে আমার দিকেই ফিরে আসতে হবে। তখন তোমরা (দুনিয়ায়) যা করেছ সেই বিষয়ে আমি তোমাদের জানাব। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সন্তানের উপর মায়ের এত অধিকারের কারন ব্যখ্যা করেছেন এবং পেটে সন্তান ধারন ও ছোট বেলা থেকে লালন পালনের নিমিত্ত মায়ের তীব্র কষ্ট যাতনার বর্ননা দিয়েছেন। তিনি বলছেন যে, সন্তানের জন্য এত ব্যথা বেদনা ও দুঃখ কষ্ট ভোগ করা সত্বেও আল্লাহর আদেশ মা-বাবার আদেশের উপর প্রাধান্য পাবে। এ ব্যপারে আল্লাহ তায়ালা সুরা আহকাফ এর ১৫-১৬ আয়াতে আরো বলেন,
ووصينا الانسان بوالديه احسانا- حملته امه كرها ووضعته كرها وحمله وفصاله ثلاثون شهرا- حتي اذا بلغ اشده وبلغ اربعين سنة قال رب اوزعني ان اشكر نعمتك التي انعمت علي وعلي والدي وان اعمل صالحا ترضه واصلح لي في ذريتي – اني تبت اليك واني من المسلمين – اهقاف -15-16
অনুবাদঃ আমি মানব মন্ডলীকে তাঁর মাতাপিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের আদেশ করছি। তাঁর মা তাকে কষ্টক্লেশ ভোগ করে পেটে ধারন করেছে। গর্ভধারন ও দুধ পানকালে মা ত্রিশ মাস পুর্ন করেছে। যখন সে শক্তি প্রাপ্ত হয় এবং চল্লিশ বছর বয়সে উপনিত হয় তখন বলে, হে আমার রব! আপনি আমাকে শক্তি দিন যাতে আমার প্রতি ও আমার পিতামাতার প্রতি আপনার প্রদত্ত নিয়ামাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। এবং আমি এমন সৎ কাজ করতে পারি যাতে আপনি খুশি হন। আর আমার সন্তান-সন্তুতিদেরকে সৎ কর্মপরায়ন করুন। আমি আপনার নিকঠ তওবা করছি এবং (ঘোষনা করছি যে) আমি একজন মুসলিম। আল্লাহর আদেশের উপর মাতাপিতার আদেশকে প্রাধান্য না দিতে আল্লাহ তায়ালা সুরা আনকাবুতের ৮ নং আয়াতে আরো বলেন,
ووصينا الانسان بوالديه حسنا وان جاهداك لتشرك بي ما ليس لك به علم فلا تطعهما- الي مرجعكم فانبئكم بما كنتم تعملون- عنكبوت – 8
অনুবাদঃ আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি মানুষকে তাঁর পিতা মাতার প্রতি সদয় আচরনের আদেশ করেছি। আর যদি তাঁরা (পিতা-মাতা) তোমাকে আমার সাথে এমন কোন কিছুকে শরীক করতে চেষ্টা করে যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তবে তুমি তাদের অনুসরন করবে না। তোমাদের আমার দিকেই ফিরে আসতে হবে। তখন তোমরা পৃথিবীতে যা আমল করেছ সে বিষয়ে আমি তোমাদের জানাব।
আল্লাহর আদেশের উপর মা-বাবার আদেশকে প্রাধান্য না দেবার বিষয়ে হযরত সায়াদ ইবনে খাওলা (রাঃ) এর ঘঠনা প্রনিধানযোগ্য। তিনি ইসলাম গ্রহন করলে তাঁর মা তাতে বাধ সাধেন। তিনি তাঁর ইসলাম গ্রহনের ব্যাপারটি একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। তাকে আল্লাহর দ্বীন থেকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আপ্রান চেষ্টা করতে থাকেন। ছেলেকে নতুন দ্বীন থেকে ফেরাতে না পেরে তিনি কি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তাই এ হাদিসে বর্নিত হয়েছে।
عن نسعاب ابن سعد ابن خولة قال قالت له امه “فوالله لا اطعم طعاما ولا اشرب شرابا حتي اموت تكفر بمحمد-
হযরত নুসয়াব ইবনে সায়াদ ইবনে খাওলা (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, আমার মা আমাকে বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি মুহাম্মাদের দ্বীন পরিত্যাগ না করলে আমি কোন আহার গ্রহন করব না এবং কোন প্রকার পানীয়ও পান করব না যতক্ষন না আমি মরে যাই। মা এ কথা বলার পরও তিনি মায়ের কথা রাখলেন না।
অন্য বর্ননায় এসেছে তাঁর মা তাকে বলল, হে আমার ছেলে, তুমি যদি মুহাম্মাদের দ্বীন না ছাড় তবে আমি মরে যাব তবুও কিছুই খাব না। লোকেরা আমার মৃত্যুর জন্য তোমাকে দায়ী করবে এবং তোমাকে মায়ের হত্যাকারী হিসেবে ডাকবে। উত্তরে তিনি বললেন,
يا اماه لو كتب لك مائة نفس فخرجت نفسا نفسا ما تركت ديني هذا فان شئت فكلي وان شئت فلا تئكلي –
অর্থাৎঃ হে আমার মা! তোমাকে যদি একশতটি প্রান দেয়া হয় এবং তুমি একটি একটি করে প্রতিটি প্রান বের করে ফেল তবুও আমি আমার দ্বীন ছাড়ব না। তোমার ইচ্ছা হলে খাও অথবা ইচ্ছা হলে না খাও।
অপর দিকে পিতামাতা যদি মুশরিক অথবা সন্তানের উপর নির্যাতনকারীও হয় তবুও তাদের সাথে ভালাচরন করতে হবে। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে,
عن اسماء بنت ابي بكر رضي الله تعلي عنهما قالت يا رسول الله صلي الله عليه وسلم قدمت علي امي وهي راغبة افاصلها؟ قال صليها- متفق عليه
অনুবাদঃ হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি রাসুল (সঃ) কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমার মা আমার নিকঠ এসেছেন অথচ তিনি এখনও মুশরিক অবস্থায় আছেন। আমি কি তাঁর সাথে সদব্যবহার করব? রাসুল (সঃ) বললেন, হা। তুমি তাঁর সাথে ভাল ব্যবহার করবে। বুখারী ও মুসলিম।
৬। পিতামাতার জন্য দোয়া করাঃ আল্লাহ তায়ালা সন্তানের উপর স্বীয় পিতামাতার জন্য অত্যন্ত সুন্দর ও প্রাঞ্জল ভাষায় দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
ربنا اغفرلي ولوالدي وللمؤمنين يوم يقوم الحساب- ابراهيم 41
অনুবাদঃ আল্লাহ তায়ালা বলেন, (তোমরা বল) হে আমাদের রব আমাকে আমার পিতামাতা ও মুমিন বান্দা দেরকে কিয়ামাতের হিসাব দিবসে ক্ষমা করে দিও।
৭। মায়ের অধিকার সবার উপরেঃ সন্তান জন্মদান, লালনপালন ও মানুষ করার ক্ষেত্রে মা-জননীকে বেশি কষ্ট ক্লেশ ও যাতনা ভোগ করতে হয়। তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁর অধিকারকে অন্যান্য সকলের উপরে স্থান দিয়েছেন। হাদিস শরীফে আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেন,
عن معاوبة رضي الله عنه قال قلت يا رسول الله من ابر قال امك قلت ثم من قال امك قلت ثم من؟ قال امك قلت ثم من؟ قال اباك ثم الاقرب فالاقرب – رواه الترمذي
অনুবাদঃ সাহাবী হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, আমি রাসুল (সঃ) কে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! সদব্যবহার পাওয়ার কে বেশি হকদার? তিনি বললেন, তোমার মা। আমি আবার বললাম, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। আমি আবার বললাম, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, তারপর কে তিনি বললেন, তোমার পিতা। অতঃপর নিকঠ থেকে নিকঠতর প্রাধান্য পাবে।
৮। পিতার খুশিতে আল্লাহর খুশিঃ মহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম হচ্ছে পিতামাতা। যে সকল বিষয় আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের সহজ উপায় মা-বাবার খেদমত তাঁর মধ্যে অতি সহজ কাজ। পিতামাতার সাথে সদব্যবহারকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উছিলা বানিয়েছেন। হাদিসে এসেছে,
عن عبد الله ابن عمرو رضي الله عنه عن النبي صلي الله عليه وسلم قال رضي الرب في رضي الوالد وسخط الرب في سخط الوالد – الترمذي
অনুবাদঃ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি নবী করিম (সঃ) হতে বর্ননা করেছেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত এবং আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত রয়েছে। তিরমিজি শরীফে এই হাদিসটি বর্নিত হয়েছে।
৯। পিতামাতার অবাধ্যতা কবিরা গোনাহঃ আল্লাহ তায়ালা যে সকল গোনাহকে বড় গোনাহ হিসেবে সাব্যস্থ করেছেন তাঁর মধ্যে পিতামাতার অবাধ্যতা ও তাদের প্রতি অসদাচরনকে গন্য করা হয়েছে। এ ব্যাপারে নিচের দুইখানা হাদিস প্রনিধানযোগ্য।
عن ابي الدرداء رضي الله عنه قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم الا احدثكم باكبر الكبائر؟ قالو بلا يا رسول الله قال الاشراك بالله وعقوق الوالدين – الترمذي وابوداود
অনুবাদঃ সাহাবী হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, রাসুল (সঃ) বলেছেন, (হে আমার সাহাবীগন!) আমি কি তোমাদেরকে সবচে বড় কবিরা গোনাহের ব্যাপারে খবর দেব না? সাহাবীগন বললেন, হ্যাঁ ! হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)। (এ ব্যাপারে আমাদেরকে বলুন)। তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা এবং পিতামাতার অবাধ্য হওয়া। তিরমিজি ও আবু দাঊদ।
عن ابي بكرة رضي الله تعالي عنه قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم كل الذنوب يغفر الله منها ما شاء الا عقوق الوالدين فانه يجعل لصاحبه في الحياة قبل الممات – مشكواة
অনুবাদঃ হযরত আবু বুকরা (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, প্রতিটি গোনাহই আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে মাফ করে দেন। কিন্তু পিতামাতার প্রতি অবাধ্যতার গোনাহ আল্লাহ তায়ালা মাফ করেন না। নিশ্চয় এই প্রকার গোনাহের অধিকারীকে মৃত্যুর পুর্বে দুনিয়াতেই পাকড়াও করেন। মিশকাত।
১০। পিতামাতার সেবা জিহাদ সমতুল্যঃ মাতাপিতার সাথে ভাল ব্যবহার ও তাদের সেবা করাকে আল্লাহর রাসুল (সঃ) জিহাদের সমতুল্য পুন্যের কাজ বলে সাব্যস্থ করেছেন। হাদিস শরীফে আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেন,
عن عبد الله بن عمرو رضي الله عنه قال جاء رجل الي النبي صلي الله عليه وسلم ليستئذنه في الجهاد قال احي والداك؟ قال نعم قال ففيهما فجاهد – متفق عليه-
অনুবাদঃ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি রাসুল (সঃ) এর নিকঠ আগমন করে জিহাদে অংশগ্রহনের অনুমতি প্রার্থনা করল। রাসুল (সঃ) তাকে বললেন, তোমার পিতামাতা জীবিত আছেন কি? সে বলল, হা। রাসুল (সঃ) বললেন, তুমি তাদের খেদমতে থেকে জিহাদ কর। বুখারী ও মুসলিম।
১১। পিতামাতার মৃত্যুর পর করনীয়ঃ জীবিত পিতামাতার প্রতি আমাদের উপর যেমন অধিকার রয়েছে, তাদের ইনতেকালের পরও কর্তব্য রয়েছে। তাদের ইনতেকালের পর আমাদের উপর কর্তব্যের মধ্যে রয়েছে তাদের জন্য আল্লাহর নিকঠ মাগফিরাত কামনা করা, তাদের ওয়াদা অংগিকার পুর্ন করা, তাদের বন্ধুদের সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের আত্বীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা, এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেন,
عن ابو اسيدالساعدي رضي الله عنه قال بينما انا جالس عند رسول الله صلي الله عليه وسلم اذ جاء رجل من الانصار- فقال يا رسول الله هل بقي علي من بر ابوي شيئ بعد موتهما ابرهما به؟ قال نعم خصال اربعة – الصلواة عليهما والاستغفار لهما-وانفاظ عهدما- واكرام صديقهما- وصلة الرحم التي لا رحم لك الا من قبلهما – فهو الذي ما بقي عليك من برهما بعد موتهما- ابو داود- مسند احمد- وابن ماجة
অনুবাদঃ সাহাবী হযরত আবু উসাইদ আস-সায়ীদি (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, একদা আমি রাসুল (সাঃ) এর নিকঠ বসা ছিলাম। এমন সময় আনছারীদের মধ্য হতে একজন মানুষ এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমার মাতাপিতার ইনতেকালের পর আমার উপর তাদের প্রতি সদাচরনের কোন কিছু বাকি রয়েছে কি? রাসুল (সঃ) বললেন, হ্যাঁ। চারটি কাজ বাকী থাকে। ১। তাদের জন্য আল্লাহর নিকঠ রহমত ও ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়া। ২। তাদের ওয়াদা পুরন করা। ৩। তাদের বন্ধুদের সম্মান করা। ৪। তাদের মাধ্যমে আত্বীয়তা সুত্র স্থাপন কারী আত্বীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। এইগুলিই হচ্ছে তোমার পিতামাতার মারা যাওয়ার পর তাদের প্রতি সদাচরন। আবু দাঊদ ও মুসনাদে আহমাদে এই হাদিস বর্নিত হয়েছে।
১২। পিতামাতার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপের ফজিলতঃ পিতা মাতা সন্তানের জন্য আল্লাহ তায়ালার এত মহান নিয়ামত যে, এর কোন তুলনাই হয়না। তাদের খেদমত করাই শুধু ফজিলতের কাজ নয়। তাদের দিকে নেক নজরে তাকালেও আল্লাহ পাক ভীষন খুশি হন। হাদিসে নবীজি (সঃ) বলেন,
عن ابن عباس رضي الله تعلي عنه قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم ما من ولد بار ينظر الي والدته نظرة رحمة الا كان له بكل نظرة حجة مبرورة- قالو وان نظر اليها كل يوم مائة مرة؟ قال نعم الله اكبر واطيب – بيهقي في شعب الايمان-
অনুবাদঃ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, রাসুল (সঃ) বলেছেন, পিতামাতার প্রতি আনুগত্যশীল এমন কোন সন্তান নেই যাকে তাঁর মাতার প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে একবার মাত্র তাকানোর জন্য একটি কবুল হজ্বের ছোয়াব দেয়া হয়না। সাহাবীগন বললেন যদি সে, দৈনিক একশত বার তাকায়? রাসুল (সঃ) বললেন, হ্যাঁ। একশত বার তাকালেও তাকে এমন নেকী দেয়া হবে। বায়হাকী।
১৩। পিতামাতার দোয়া কবুলঃ সন্তানের জন্য পিতামাতাকে আল্লাহ তায়ালা এতই দামী ও গুরুত্বপুর্ন মর্যাদা দান করেছেন যে, সন্তানের জন্য তাদের দোয়া কবুলের ঘোষনা প্রদান করা হয়েছে। আর কারো ব্যাপারেই এরকম গ্যারান্টিমুলক প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়নাই। হাদিস শরীফে এসেছে,
عن ابي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم ثلثة دعواة مستجابات لا شك فيهن – دعوة الوالدين ودعوة المظلوم – ودعوة المسافر-
অনুবাদঃ হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, রাসুল (সঃ) বলেছেন, তিন প্রকারের দোয়া কবুলযোগ্য এতে কোন সন্দেহ নেই। পিতামাতার দোয়া, মজলুমের দোয়া এবং মুসাফিরের দোয়া।
১৪। পিতামাতা বেহেস্ত লাভের মাধ্যমঃ পিতামাতা হচ্ছে সন্তানের জান্নাত লাভের উপায়। তাদের খেদমতের মাধ্যমে যত সহজে জান্নাত লাভ করা যায় অন্যকোন উপায়ে তা হয়না। এমনকি বলা যায় যে তাদের খেদমত তথা সন্তুষ্টি ছাড়া জান্নাত লাভ করা সম্ভব নয়। পিতা মাতা সন্তুষ্ট হলে আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে বান্দাকে জান্নাত দিবেন অন্যথায় জান্নাতে যাওয়া সম্ভব হবে না। হাদিস শরীফে আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেন,
عن ابي الدرداء رضي الله عنه قال ان رجلا اتاه فقال ان لي امرئة وان امي تئامرني بطلاقها- قال ابو الدرداء سمعت رسول الله صلي الله عليه وسلم الوالد اوسط ابواب الجنة – فان شئت فاضع ذالك الباب او احفظه – احمد وابن ماجة
অনুবাদঃ সাহাবী হযরত আবুদ দারদা (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তাঁর নিকট আগমন করে বলল, আমার একজন স্ত্রী রয়েছে। আমার মা তাকে তালাক দিতে আদেশ করেছেন। আবুদ দারদা (রাঃ) তাকে বললেন, আমি রাসুল (সঃ) কে বলতে শুনেছি নিশ্চয় তোমার পিতা জান্নাতের দরজা সমুহের মধ্যবর্তী দরজা। তুমি ইচ্ছা করলে তা বিনষ্ট কর অথবা তাকে হিফাজাত কর। মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে মাজাহ। অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেন,
عن ابي امامة رضي الله عنه قال ان رجلا قال يا رسول الله صلي الله عليه وسلم ما حق الوالدين علي ولدهما؟ قال هما جنتك ونارك – رواه ابن ماجة
অনুবাদঃ সাহাবী হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল (সঃ) কে প্রশ্ন করিল, সন্তানের উপর পিতা মাতার কি অধিকার রয়েছে? রাসুল (সঃ) বললেন, তারাই তোমার জান্নাত এবং তারাই তোমার জাহান্নাম। ইবনে মাজাহ। এই বিষয়ে রাসুল (সঃ) এর নিম্নের হাদিস খানা বিশেষভাবে প্রনিধান যোগ্য। এখানে বৃদ্ধ পিতামাতাকে যারা খেদমত করবে না তারা জান্নাতে যেতে পারবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
عن سهيل عن ابيه عن ابي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلي الله عليه وسلم قال رغم انف ثم رغم انف ثم رغم انف قيل من يا رسول الله صلي الله عليه وسلم قال من ادرك ابويه عند الكبر احدهما اوكلاهما فلم يدخل الجنة- اخرجه مسلم
অনুবাদঃ হযরত সুহাইল (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি হযরত আবু হুরায়রা (আঃ) হতে বর্ননা করেন এবং তিনি নবী করিম (সঃ) হতে বর্ননা করেছেন। তিনি বলেন, নাক ধুলিস্যাৎ হোক অতঃপর নাক ধুলিস্যাৎ হোক অতঃপর নাক ধুলিস্যাৎ হোক। সাহাবীগন জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সঃ) কার নাক ধুলিস্যাৎ হোক? রাসুল (সঃ) বললেন, যে ব্যক্তি তাঁর পিতা মাতা দুইজনকে অথবা একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল অথচ বেহেস্তে যেতে পারল না। মুসলিম। এই হাদিস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, বৃদ্ধ পিতামাতার খেদমতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে জান্নাত দেন। অপর দিকে তাদের খেদমতে ব্যর্থ হলে ঐ সন্তানকে জান্নাতে প্রবেশ করার সুযোগ দেবেন না। এ ব্যাপারে আরো একখানা হাদিস উল্লেখযোগ্য।
عن عبد الله بن عباس رضي الله عنه قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم من اصبح مطيعا للله في والديه اصبح له بابان مفتوحان من الجنة- وان امسي فمثل ذالك – ومن اصبح عاصيا للله في والديه اصبح له بابان مفتوحان علي النار – وان امسي مثل ذالك – وان كان واحدا فواحد – قال رجل وان ظلماه؟ قال وان ظلماه وان ظلماه وان ظلماه؟ رواه البيهاقي في شعب الايمان
অনুবাদঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্নিত তিনি বলেন, রাসুল (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি স্বীয় পিতামাতার হকের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার অনুগত হয়ে ভোরে ঘুম থেকে জেগে উটে, তাঁর জন্য সকালে জান্নাতের দুটি দরজা খোলা হয়ে থাকে। এমনি ভাবে বিকাল বেলাও অনুরুপ হয়ে থাকে। আর যে ব্যক্তি স্বীয় পিতা মাতার ব্যাপারে সকালে আল্লাহ তায়ালার অবাধ্য হয় তাঁর জন্য সকালে জাহান্নামের দুটি দরজা খোলা হয়। এমনিভাবে বিকাল বেলাতেও এমন হয়। আর যদি একজনের ব্যাপারে এমন হয় তবে একটি করে দরজা খোলা হয়। এক ব্যক্তি বললেন, যদি পিতামাতা উভয়ে আত্যাচারী হয়? রাসুল (সঃ) বললেন, যদি তারা অত্যাচারী হয়, যদি তারা অত্যাচারী হয়, যদি তারা অত্যাচারী হয় তবুও এমন করা হবে। ইমাম বায়হাকী শুয়াবুল ইমানে বর্ননা করেছেন।
পরিশেষে আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদেরকে আমল করার তৌফিক দেন এই কামনা করচি। আমীন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments