Monday, July 26, 2021
No menu items!
Home ছোট গল্প জীবনের বাস্তবতা : বাবা এবং ছেলে

জীবনের বাস্তবতা : বাবা এবং ছেলে

স্কুল জীবনের এক বন্ধু। প্রচুর টাকা পয়সার মালিক। ওর ভাষায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার মত হবে। পেশায় ব্যাংকার। প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করে এত টাকার মালিক ক্যামনে হইলো আল্লাহ জানে। চাকরির পাশাপাশি নাকি আবার রিয়েল এস্টেটের ব্যবসাও করে।

ওর বাবা অমায়িক একজন মানুষ। যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, তখন আমরা পাশাপাশি বাসায় থাকতাম। আমাকে ভিষন আদর করতেন উনি। তার ছোটখাটো ব্যবসা ছিলো। দিন আনি দিন খাই টাইপের ব্যবসা আরকি। অবস্থা খুব একটা ভালো ছিলোনা।

গরমের দিন এলে দেখতাম রাতের বেলায় বাসার পেছনে তেতুল গাছের নীচে বসে বাতাস খেতে। বাসায় একটা মাত্র ফ্যান ছিলো, যেটা ছেলের রুমে ছিলো। ছেলেদের ঘুমের যেন সমস্যা না হয়, সে জন্য তাদের রুমে ফ্যানের ব্যবস্থা করেছিলেন। নিজে কস্ট করতেন।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পর্যন্ত দেখেছি, খুব কস্ট করে ছেলেগুলোকে তিনি পড়াশোনা করিয়েছেন। এমনও ঈদ গেছে, তার বাড়িতে ভালোমন্দ রান্না হয়নাই। কিন্তু ছেলের প্রাইভেটের টাকা ঠিকই দিয়েছেন। তাদের নতুন কাপড় চোপড় দিয়েছেন। আরো প্রচুর কস্টের কাহিনী আছে ওর বাবার, যা বলে শেষ করা যাবেনা।

যাইহোক, এইচএসসি পরীক্ষার পর সেই বন্ধুর সাথে আমার বহুদিন দেখা নেই। প্রায় ২০ বছর। একদিন জামালপুর সমিতির মিটিং এ গিয়ে দেখা। ইতিমধ্যে তার বড়লোক হওয়ার খবর অনেকের কাছেই জানতে পেরেছি।

খুব বেশি একটা কথা সেদিন হলোনা। এতদিন পর দেখা, কিন্তু কেন জানি কোন আবেগ কাজ করলোনা। দেখলাম সাথে একজন পিএ টাইপের কেউ। তাকে দিয়ে আমার ফোন নাম্বার লিখিয়ে নিলো। আমিও ওর ফোন নাম্বার নিলাম।

সেই সাক্ষাতের কিছুদিন পর, হঠাৎ একদিন সেই বন্ধুর ফোন। আমি ফোন ধরলাম;

  • বন্ধু কি অবস্থা? জিজ্ঞাসা করলাম।
  • আর বইলোনা। অনেক দিন ধরেই ভাবতেছিলাম, তোমাকে ফোন দিবো, কিন্তু এত ব্যস্ততা যে সময়ই ম্যানেজ করতে পারিনাই।
  • আমি বললাম, কোথায় আছো এখন?

সে বললো,

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সাথে একটা মিটিং ছিলো, শেষ করেই বের হলাম। কালকে আবার গভর্নরের সাথে মিটিং।

ওর কথা শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেলো। কি বলবো ভাবতেছিলাম। বিরাট ব্যাপার স্যাপার। আমার ভাবনার মধ্যেই সে আবার বললো,

  • দোস্ত তোমার সাথেতো বহুদিন পর দেখা হইলো সেদিন, সময় দিতে পারলাম না, তা তুমি কি করো এখন?
  • বললাম, ছোটখাটো ব্যবসা করি। বলার মতো কিছুনা। আচ্ছা, আংকেল, আন্টি কোথায় আছেন? উনারা কেমন আছেন? উনাদের আমার সালাম দিও।

বললো,

  • আব্বা, আম্মা আমার বাসায়ই আছেন। এলাকায় এক দেড় কোটি টাকা খরচ করে ডুপ্লেক্স করে দিছি, কিন্তু আমাকে ছাড়া থাকেনা। বাড়িটা খালি পড়ে আছে।

আরো দুই-চারটা কথা বলে ফোন রেখে দিলাম। এরপর থেকে মাঝে মাঝেই অকারণে ফোন দেয়। ফোন দিয়ে তার সাকসেস, সম্পত্তি, বর্তমান স্ট্যাটাস এইসব বিষয়গুলো গর্বের সাথে শেয়ার করে। সত্য মিথ্যা সেই ভালো জানে।

একদিন ফোন করেছে ;

  • দোস্ত, একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছিনা। একটু সাহায্য করো।

বললাম, কি?

  • স্বপ্ন ছিলো মেয়েটাকে ঢাকার সবচেয়ে দামি স্কুলে পড়াবো, কিন্তু এখনতো কুলিয়ে উঠতে পারতেছিনা।
  • কেন? কি সমস্যা?
  • মাসে ২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। আমার জন্য কষ্ট হয়ে যায়।

আমি, বললাম, তাহলে এখন কি করবা?

  • দেখি কি করা যায়। ভর্তি যখন করেছি, পড়াশোনাতো করাতেই হবে।

আমি ভাবতেছিলাম এত টাকা এক মাসের বেতন! কি স্কুল এইটা। কত কিছুই এখনো জানিনা। আরেকদিন ফোন দিয়ে বলতেছে;

  • তুমি কি কালকে ফ্রি আছো?
  • আমি বললাম, ফ্রি আছি। কেন?
  • তোমাকে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।

বললাম, কোথায়?

  • আর বইলোনা, প্রধান বিচারপতির মেয়ের বিয়ে। দাওয়াত দিছে, যেতেই হবে। সারে ৯ ভরি স্বর্ণের সেট কিনছি।
  • বললাম, তোমাকে দাওয়াত দিছে, আমি যাবো কেন? তুমি যাও। আমি ফোন রেখে দিলাম।

ওর এইসমস্ত চাপাবাজীর পরিমান যখন বেশি হতে লাগলো, তখন ফোন ইগনোর করতে শুরু করলাম।

মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে ফোন ধরতে হতো। নইলে এসএমএস করতো। Please pick the phone. Its urgent.

ফোন ধরেছি;

  • দোস্ত, উত্তর খান আর গাজিপুরে আমার ২৫ বিঘার মতো জমি আছে, এই জমিগুলো দিয়ে কি করা যায়?
  • আমি কি জানি?
  • একটা পরামর্শ দাও তুমি। আমি বিশ্বস্ত কাউকে পাইতেছিনা; যাকে দিয়ে কিছু করাবো;
  • আমি বললাম কাউকে না পাইলে বেচে দাও।

এই সমস্ত ফাউল আলাপ আর সেল্ফ পাবলিকেশন তার চলতেই থাকলো।

একদিন হুট করে উত্তরা আসছে আমার শোরুমে। এসেই পকেট থেকে ১১ লক্ষ টাকার একটা চেক বের করে আমাকে দেখালো। বললো, এইটা আমার একদিনের ইনকাম। এক পার্টির একটা জমির কাগজ ঠিক করে দিছি শুধু। আমি খুব একটা ইন্টারেস্ট দেখাইলাম না।

চলে যাওয়ার সময় তার চশমাটা দিয়ে গেলো লেন্সটা পাল্টানোর জন্য। বললাম, ২ দিন পর কাউকে পাঠিয়ে দিও, নিয়ে যাবে।

৪/৫ দিন পর ফোন দিছে;

  • দোস্ত, আমার চশমাটা কি হইছে? আমি কি লোক পাঠাবো?

আমি বললাম পাঠিয়ে দাও।

  • শোন, একটা লোক যাবে, বুড়ামত দাড়িওয়ালা। আমি তোমার নাম্বার দিয়ে দিলাম। যদি ঠিকানা খুজে না পায়, তবে তোমাকে ফোন করবে।

জিজ্ঞাসা করলাম, লোকের নাম কি? ও বললো সমস্যা নাই। অফিসেরই লোক, তোমাকে ফোন দিবে।

  • ঘন্টা দুয়েক পর, একজন রোগা, পাতলা, বয়সের ভারে ক্লান্ত এক বৃদ্ধ আমার শোরুমে ঢুকে সোজা চলে আসলো আমার কাছে। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লক্ষ করলাম তার হাত কাপছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কিছু বলবেন?
  • তুমি সোহাগ না?
  • আমি বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকেতো চিনতে পারছিনা। আপনি কে?
  • আমাকেতো আজমত (ছদ্দনাম) বলে নাই এটা তোমার দোকান। শুধু বললো আপনি গেলেই চশমা দিয়ে দিবে। আমিতো দোকানে ঢুকেই তোমাকে চিনতে পারছি।
  • কিন্তু আমি তখনো চিনতে পারিনি তাকে। বললাম আংকেল আপনার পরিচয়?
  • আমি আজমতের ‘বাবা’ !

আমি সম্পুর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। প্রায় ২২ বছর পর তার সাথে দেখা। আমি আসলে প্রস্তুত ছিলামনা তাকে এভাবে দেখবো। আর চিন্তাতেও আসেনাই তার বাবার কথা। আমার শুধু মনে হচ্ছে আজমত একটা লোক পাঠানোর কথা। বললো বুড়ামত লোক! কিন্তু ওর বাবাকে এভাবে..?

আমি তাকে যথাসাধ্য আপ্যায়ন করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি এক কাপ চা ছাড়া কোন কিছুই গ্রহন করলেন না।

  • বললাম, চাচা কি দিয়ে আসছেন?

বললো বাসে আসছি বাবা।

  • আমি বাকহারা হয়ে গেলাম। এই শরির নিয়ে সে বাসে আসছে! বললাম, আপনার ছেলে আমাকে ফোন করে বলেছে, সে একটা লোক পাঠাচ্ছে, কিন্তু আপনার কথাতো বলে নাই, আপনি আসবেন।

সে কিছু বললোনা। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। মনে হলো লজ্জা আর অপমানে সে বিপর্যস্ত। আহারে ছেলে!

আমি হাতদুটো ধরলাম। ক্ষমা চাইলাম না চিনতে পারার অপরাধে। বাইরে এসে সিএনজি ঠিক করে দিলাম।

বললো, ভাড়াতো দিয়ে দেয়নাই। সিএনজিতে গেলে হয়ত ছেলে রাগ করবে। আমি বললাম, আংকেল এটা আমি দিয়ে দিচ্ছি, প্লিজ আপনি না কইরেন না। সে চলে গেলো। আমি তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

ছেলে কোটিপতি হয়ে বাবাকে বানিয়েছে লোক। পরিচয় দিতেও লজ্জা পায় হয়ত। ভাবছি কতটা সুখে রেখেছে বাবা-মাকে। এই যে সম্পদ, কোটি কোটি টাকার গল্প, এত সাফল্যের গল্প,, এগুলোর মুল্য কি?

একদিন ঘটনাক্রমে এক বন্ধুর সাথে ব্যাপারটা শেয়ার করলাম। সে বন্ধু হেসেই খুন।

  • বললাম, তুই হাসছিস কেন?

বললো, তুই এতটুকুতেই এত আপসেট? ঐ ফাজিলতো ওর বাপকে ওর অফিসের পিওন হিসেবে কাজ করায়। সিগারেট আনানোসহ এমন কোন কাজ নেই যা সে বাপকে দিয়ে না করায়।

বিবেকের কাছে লজ্জিত হলাম। সন্তান এমন কেন হবে? ব্যর্থতাটা আসলে কার? বাবার? নাকি সন্তানের? নাকি এই সমাজের?

RELATED ARTICLES

খুলনার ১৩৮ তম শুভ জন্মদিন উদযাপন

মোঃ ইউসুফ শেখ, খুলনা প্রতিনিধিঃ খুলনা জেলা হলো বাংলাদেশের  দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রশাসনিক এলাকা এটি জাহানাবাদ নামেও পরিচিত। এটি খুলনা বিভাগে অবস্থিত। জন্মদিনের ইতিহাসঃ ১৮৪২...

করোনায় ভাড়াটিয়াদের ভাড়া পরিশোধের বাড়িওয়ালার হুশিয়ারী!

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ লৌহজংয়ে বসবাসরত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত লোকজন সর্বনাশা নভেল করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সরকারি ত্রাণ সামগ্রী না পেয়ে অর্ধাহারে - অনাহারে...

লৌহজংয়ে জরুরী প্রয়োজন ব্যাতীত বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ প্রশাসনের

আ স ম আবু তালেব, বিশেষ প্রতিনিধিঃ জরুরী প্রয়োজন ব্যাতীত চলাচলকারী সকল লোকজন, ইজিবাইক, মিশুক ও রিক্সা চালকদের সতর্ক করা হয়েছে।...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

কোভিট-১৯: বগুড়ায় উপসর্গহীন এক ব্যক্তি আক্রান্ত

এমদাদুল হক, বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়ায় উপসর্গহীন এক ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বগুড়া শহীদ...

মুন্সীগঞ্জে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে মোবাইল কোর্ট অব্যাহত

স্টাফ রিপোর্টারঃ রমজান মাসে বাজার মনিটরিং, ও দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে মুন্সীগঞ্জের প্রত্যেক উপজেলার প্রতিটি বাজারে সম্প্রতি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে।

করোনা প্রতিরোধে লৌহজং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক কমিটির জরুরী সভা

আ স ম আবু তালেব, বিশেষ প্রতিনিধিঃ গত ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার বেলা ১২:৩০ মিনিটে ক‌রোনা ভাইরাস প্রতি‌রো‌ধে উপ‌জেলা স্বেচ্ছা‌সেবক ক‌মি‌টির জরুরী সভা...

বাংলাদেশে উন্মুক্ত হলো “মেসেঞ্জার কিডস” – শিশুদের উপযোগী ম্যাসেজিং প্ল্যাটফর্ম

ইউরেকা অনলাইন ডেস্কঃ মহামারী করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ মানুষ লকডাউনে বাড়িতে আটকে থাকায় শিশুদের কথা বিবেচনা করে শিশুদের উপযোগী মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম মেসেঞ্জার...

Recent Comments